এবার মেহেরপুরের ৩৯৯ গৃহহীন পরিবারের ঈদ উদযাপন নিজ বাড়িতে

আকলিমা খাতুন। বয়স এখন ৬২ বছর। ২২ বছর বয়সে বিয়ে হয় চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। কয়েক বছর সংসার করার পর মেয়ে সন্তান হওয়ায় স্বামী রফিকুল ইসলাম বাবু ৪১ বছর আগে আকলিমাকে ছেড়ে চলে যান। তখন থেকে প্রতিবন্ধী মেয়ে আশাকে নিয়ে জীবিকার তাগিদে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান আকলিমা। সেই সঙ্গে খুপরি ঘরে থাকতে শুরু করেন।

এরমধ্যে আকলিমার এই কষ্টের জীবনে কত যে ঈদ গেছে আর এসেছে তার কোনো খবর নেই। এভাবে প্রায় ৪০ বছরটি বছর মেহেরপুরের পৌরগড় পুকুরের পাশে খুপরি ঘরেই ঈদের সময় কেটেছে আকলিমার।

jagonews24

তবে গত এক বছর ধরে আকলিমার জীবনে ঈদ এসেছে অন্যরকমভাবে। কারণ তিনি এখন আশ্রয়ণ প্রকল্পের একটি ঘরের মালিক। মেহেরপুর সদর উপজেলার আমদহ ইউনিয়নের শিশুবাগান পাড়ায় তিনি এখন নিজ বাড়িতে ঈদ উদযাপন করেন। ২১ জুলাই আকলিমাকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুই শতাংশ জমি ও একটি ঘর দেয় স্থানীয় প্রশাসন।

আরও পড়ুন: মধুমতির ভাঙনে বিলীন অস্থায়ী রক্ষা বাঁধ, হুমকিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প

আকলিমা খাতুন বলেন, স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর কিছুদিন খোলা আকাশের নিচে শিশু সন্তানকে নিয়ে থেকেছি। এরপর কোথায়ও ঠাঁই না পেয়ে পৌরগড় পুকুরের পাশে খুপরি ঘরে থেকেছি বছরের পর বছর। বেঁচে থাকার তাগিদে করতে হয়েছে ভিক্ষা।

jagonews24

আকলিমা জানান, সরকারের দেওয়া ঘরে গত বছরের ঈদুল আজহা এবং এই বছরের ঈদুল ফিতর উদযাপন করছেন তিনি।

আরও পড়ুন: নজর কেড়েছে জাতীয় পতাকার আদলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর

মেহেরপুর জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় মেহেরপুরে চারটি পর্যায়ে ৩৯৯টি ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয় প্রশাসন। তাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয় দুই শতাংশ করে জমি। এবার সেই পরিবারগুলো ঈদ উদযাপন করছে নিজ বাড়িতে।

শুধু আকলিমা নয় এমন আরও অনেক অসহায় মানুষ রয়েছেন। এরমধ্যে গাইবান্ধার শ্রবণ প্রতিবন্ধী আব্দুল জলিল (৫৮)। ৪০ বছর আগে তিনি মেহেরপুরে স্ত্রী-ছেলেমেয়ে নিয়ে যান। সহায়-সম্বলহীন আব্দুল জলিল সরকারি জায়গায় খুপরি ঘর করে ৪০ বছর বসবাস করেছেন। আর স্ত্রী রহিমা শ্রমিকের কাজ করে যা আয় করেন, তা দিয়েই তিন সন্তানের পড়ালেখা ও সংসার চলতো। আব্দুল জলিল ও রহিমা দম্পতিকে দুই শতাংশ জমিতে একটি ঘর নির্মাণ করে দিয়েছে সরকার।

jagonews24

আব্দুল জলিলের স্ত্রী রহিমা খাতুন বলেন, প্রতিবছর পাড়া-প্রতিবেশীরা যে সহযোগিতা করতেন, তা দিয়েই ঈদ পার হতো। গত বছর নিজের ঘরে ঈদের সেমাই ও পিঠা রান্না করা হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অনেক ভালো আছি।

আরও পড়ুন: আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর আছে, থাকেন এলাকার বাইরে

মেহেরপুর শহরের সোনা ভানুর (৪৫) কোনো ঘরবাড়ি নেই। চার বছর আগে স্বামী বাবর আলী মারা গেলে সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনি। বর্তমানে তিনি শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। প্রতিদিন ২০০ টাকা হাজিরা পান। এই দিয়ে চলে তার সংসার। জীবিকা নির্বাহ একটু কষ্ট হলেও সরকারের দেওয়া নিজের বাড়িতে ভালো আছেন সোনা ভানু।

অপরদিকে আখের রস ব্যবসায়ী আয়জুদ্দীন (৬৩)। আখের রস বেচে যা আয় হতো, তা দিয়ে ঘরভাড়া করার সামর্থ্য ছিল না তার। আমদহ ইউনিয়নের শিশুবাগানপাড়ায় দুই শতাংশ জমিসহ একটি ঘর পেয়েছেন তিনি। সেই ঘরে এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে ঈদ উদযাপন করেছেন তিনি।

আয়জুদ্দীন বলেন, জীবনে কখনো ভাবিনি নিজের একটি ঘর হবে। এই ঘর যারা দিয়েছেন, তাদের জন্য প্রাণ ভরে দোয়া করি।

জেলা প্রশাসক আজিজুল ইসলাম বলেন, সারা দেশে এমন অসংখ্য মানুষ রয়েছেন, যাদের দারিদ্র্যের কারণে আনন্দগুলো চাপা পড়ে যাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী সেই সব মানুষের সুখের সন্ধান দিচ্ছেন। মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকার জন্য বাড়ি বানিয়ে দিয়েছেন। তারা আর অবহেলার ভিড়ে হারিয়ে যাবেন না।

আসিফ ইকবাল/জেডএইচ



https://ift.tt/iT3ylwc
from jagonews24.com | rss Feed https://ift.tt/iLcGYsF
via IFTTT
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url